কর্ম আগে, না ধর্ম আগে? – একটি চিন্তাশীল দার্শনিক পর্যালোচনা
🕉️ কর্ম আগে, না ধর্ম আগে? – একটি চিন্তাশীল দার্শনিক পর্যালোচনা
ধর্ম ও কর্ম — দুটি শব্দ, কিন্তু যুগে যুগে এগুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন, বিতর্ক ও ভাবনা কখনো থেমে থাকেনি। অনেকে বলেন, “ধর্ম আগে”, কারণ তা নীতির মূল ভিত্তি। আবার কেউ বলেন, “কর্ম আগে”, কারণ জীবনের বাস্তব চালিকাশক্তি কর্মই। আসুন, বিষয়টি আমরা দর্শন, ধর্মগ্রন্থ, এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্লেষণ করি।
🔍 ধর্মের মূল তাৎপর্য কী?
“ধর্ম” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত 'ধৃ' ধাতু থেকে, যার অর্থ—ধারণ করা বা টিকিয়ে রাখা। অর্থাৎ ধর্ম এমন একটি চেতনা, যা জীবনের মৌল ভিত্তিকে ধরে রাখে। এটি কেবল উপাসনা, আচার, অথবা ধর্মীয় রীতি নয়—বরং এর গভীরে রয়েছে নৈতিকতা, মানবিকতা, ও আত্মিক শুদ্ধতা।
তৈত্তিরীয় উপনিষদে বলা আছে – “সত্যং ব্রু্যাৎ, ধর্মং চর।” অর্থাৎ, সত্য বলো, এবং ধর্মাচরণ করো — তবে সে ধর্ম যদি জীবনের আচরণে প্রকাশ না পায়, তবে তা মুখের বুলি মাত্র।
🛠️ কর্ম: জীবনের চালিকা শক্তি
“কর্ম” মানে কাজ বা কর্তব্য। কর্মের মাধ্যমেই মানুষ তার লক্ষ্যে পৌঁছায়, সমাজ গঠিত হয়, এবং আত্মোন্নতি ঘটে। কর্ম ব্যতীত ধর্ম কেবল অলস চিন্তা, আর ধর্মবিহীন কর্ম হয় নিঃস্ব আত্মা।
শ্রীকৃষ্ণ গীতায় (৩.৮) বলেছেন — “নিয়তং কুরু কর্ম ত্বং কর্ম জ্যায়ো হ্যকর্মণঃ।” অর্থ: নিয়মিত ও সৎকর্ম সম্পাদন করো, কারণ কর্মহীনতা নয়, বরং কর্মই শ্রেয়।
এখানে “নিয়ত কর্ম” বলতে বোঝানো হয়েছে – ব্যক্তির নিজ নিজ দায়িত্ব, পেশাগত কর্তব্য, সামাজিক দায়িত্ব এবং আত্মোন্নতিমূলক কাজ।
⚖️ কর্ম আগে, না ধর্ম?
অনেকে মনে করেন, ধর্ম আগে—কারণ ধর্ম মানুষকে সৎপথে চালিত করে। আবার বাস্তববাদীরা বলেন, কর্মই প্রকৃত ধর্ম, কারণ কর্মহীন ধর্ম সমাজে কার্যকর হয় না।
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন: “They alone live who live for others, the rest are more dead than alive.”
অর্থাৎ, যারা অন্যের জন্য কাজ করেন, তারাই প্রকৃতভাবে বেঁচে থাকেন—অন্যরা কেবল বেঁচে থাকা নামক জীবন্ত মৃত্যু যাপন করেন।
অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন— “যে ধর্ম জীবনের সঙ্গে মিশে নাই, সে ধর্ম মৃত্যু।” এই উক্তির মাধ্যমে বোঝা যায়, ধর্ম যদি জীবনের প্রতিদিনের কাজের সঙ্গে না মেলে, তবে তা কেবল জড় পদার্থ।
🧘 উপসংহার: সমন্বয়ের পথে
ধর্ম ও কর্ম—এ দুটি একে অপরের পরিপূরক। ধর্ম কর্মকে নৈতিকতা দেয়, আর কর্ম ধর্মকে বাস্তব ভিত্তি দেয়।
তাই বলা যায়—
“সৎ কর্মই প্রকৃত ধর্ম, আর সত্য ধর্মই কর্মের অনুপ্রেরণা।”
ধর্ম যদি শুধু মন্দির, মসজিদ বা উপাসনালয়ে সীমাবদ্ধ থাকে, এবং কর্মে তা প্রকাশ না পায়, তবে সেই ধর্ম খণ্ডিত।
চলুন আমরা নিজেদের জীবনে এমন এক ধর্ম চর্চা করি, যা কর্মে প্রকাশ পায়—সততায়, মানবতায়, দায়িত্বে।
📚 তথ্যসূত্র:
- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – অধ্যায় ৩, শ্লোক ৮
- তৈত্তিরীয় উপনিষদ – শিক্ষাবল্লী
- Complete Works of Swami Vivekananda, Vol. 4
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – 'ধর্ম' প্রবন্ধ (সাহিত্যে ও সমাজে)
✍️ লেখক:নিতাই বাবু— পুরস্কারপ্রাপ্ত নাগরিক সাংবাদিক -২০১৭। সহযোগিতায় ও ব্লগ ডিজাইন: ChatGPT by OpenAI
|
নিতাই বাবু
পুরস্কারপ্রাপ্ত নাগরিক সাংবাদিক – ২০১৭। লেখালেখির শুরু শৈশবে, এখনো চলছে। 🌐 ব্লগ: নিতাই বাবু ব্লগ | জীবনের ঘটনা | চ্যাটজিপিটি ভাবনা |

Comments
Post a Comment