কী লিখবেন— পর্ব ৪

 

কী লিখবেন সিরিজ — পর্ব ৪: কীভাবে বাক্যগঠন করবেন?

কী লিখবেন সিরিজ — পর্ব ৪

বিষয়: কীভাবে বাক্যগঠন করবেন — সরল ও জটিল বাক্যের ভারসাম্য, সংক্ষিপ্ত ও প্রাঞ্জল বাক্য লেখা, রূপান্তর ও পুনর্লিখন।  |  লেখক: নিতাই বাবু

প্রস্তাবনা — বাক্য হল যে কোনো লেখার নৃবহমান কঙ্কাল। ভাল বাক্য লেখা মানে পাঠককে দ্রুত বোঝানো, মনোযোগ ধরে রাখা এবং ভাব প্রকাশের সঠিক ছন্দ তৈরি করা। এই পর্বে আমরা ধাপে ধাপে শিখব — কীভাবে বাক্যের অংশগুলো ব্যবহার করে শক্তিশালী ও প্রাঞ্জল বাক্য গঠন করা যায়, কিভাবে মহড়া দিয়ে অভ্যাস গড়া যায়, এবং জমে থাকা খসড়া কিভাবে ঝরিয়ে দেওয়া যায়।

১। বাক্যের মৌলিক উপাদান (Building blocks)

প্রতিটি বাক্য সাধারণত তিনটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত — বিষয় (Subject), কর্ম/ক্রিয়া (Verb)বস্ত্ত/লক্ষ্য (Object)। এর বাইরে modifiers (বিশেষণ/ক্রিয়াবিবরক), অব্যয় (prepositions/particles) ও clauses (সহবাক্য) থাকে।

উদাহরণ:
“রাশিদ (বিষয়) বইটি (বস্ত) পড়ে (ক্রিয়া)।” — এটি সরল, পূর্ণবাক্য।

বেসিকভাবে অবකාশ নিন — প্রথমে সরল বাক্য ভালোভাবে লিখতে শিখুন, পরে ধীরে ধীরে modifiers ও subordinate clauses যোগ করুন।

২। সরল ও জটিল বাক্যের ভারসাম্য

সরল বাক্য দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেয়; জটিল বাক্য একই সাথে ভাব গভীরতা ও প্রেক্ষাপট দিতে পারে। পাঠক মনোযোগ ধরে রাখতে একটি ভাল অনুচ্ছেদে সাধারণত ৬০% সরল এবং ৪০% জটিল বাক্য রাখতে পারেন — তবে বিষয়ভিত্তিক নমনীয়তা দরকার।

উদাহরণ — একক ধাঁচের সমস্যা:
একাধিক সরল বাক্য একসাথে দিলে লেখাটি কাটাছেঁড়া মনে হতে পারে:
“আমি সকালবেলা উঠি। আমি কফি বানাই। আমি নিউজ দেখি। আমি লিখতে বসি।”

উপায়: বাক্যগুলো মিশিয়ে ছন্দ আনুন:
“আমি সকালবেলা উঠে কফি বানিয়ে নিউজ দেখি — তারপরই লিখতে বসি।” (সরল + জটিল মিলিয়ে ছন্দ)

৩। সংক্ষিপ্ত, পরিষ্কার ও প্রাঞ্জল বাক্য তৈরির টিপস

  1. অ্যাকটিভ ভয়েস ব্যবহার করুন — সম্ভব হলে passive এড়ান।
    অশ্বচালিত (Passive): “নির্দেশাবলী পোস্ট করা হয়েছে।” → সংস্থান (Active): “আমি নির্দেশাবলী পোস্ট করেছি।”
  2. দূর্বল ক্রিয়া বদলান — “করেছে/হয়েছে” জাতীয় দুর্বল ক্রিয়ার বদলে নির্দিষ্ট ক্রিয়া ব্যবহার করুন।
    দুর্বল: “সে তদন্ত করেছে।” → শক্তিশালি: “সে তদন্ত চালিয়েছে।”
  3. আবর্জনা শব্দ বাদ দিন — “অত্যন্ত”, “বিশেষভাবে” প্রভৃতি যদি অনর্থক হয় কেটে ফেলুন।
  4. নামধারী/নামকরণ (Nominalization) হ্রাস করুন — ক্রিয়া থেকে নাম বানানো অতিরিক্ত অস্পষ্টতা দেয়।
  5. পরিবর্তে নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করুন — "বড়", "ভাল" বদলে কিরকম বড়/কেমন ভাল তা বলুন।
  6. প্যারালেল স্ট্রাকচার বজায় রাখুন — তালিকা বা ধারাবাহিক অংশে একই ধরনের বাক্য গঠন রাখুন।
টিপ: প্রত্যেক লেখা শেষে ২-মিনিটে “অপ্রয়োজনীয় শব্দ” স্ক্যান করুন — কেটে ফেলুন। এতে বাক্য স্বচ্ছ হয়।

৪। অভ্যস্তি অনুযায়ী রূপান্তর ও পুনর্লিখন (Rewriting habits)

লেখার মান বাড়াতে নিয়মিত পুনরাবৃত্তি দরকার — প্রথম খসড়া লিখুন দ্রুত, পরে সম্পাদনা করুন ধীরে। নিচে একটি সাধারিত পুনর্লিখন প্রসেস:

  1. প্রথম খসড়া: ভীত না হয়ে দ্রুত ভাব লিখুন — সম্পাদনায় ভয় পাবেন না।
  2. বাক্যভাবে সম্পাদনা — pass 1: অনুচ্ছেদভিত্তিক দেখুন: প্রতিটি অনুচ্ছেদ একটি প্রধান ধারণা বলছে কি না?
  3. বাক্যভাবে সম্পাদনা — pass 2: অপ্রাসঙ্গিক শব্দ, দীর্ঘবাক্য ও জটিল গঠন খুঁজে বের করে সরল করুন।
  4. প্রমাণপাঠ: উচ্চস্বরে পড়ে দেখুন — যেখানে থিতু হচ্ছে সেখান ঠিক করুন।

৫। ছন্দ, বিরতি ও পঙ্গুতা (Pacing and Rhythm)

বাক্যের দৈর্ঘ্য ও punctuation পাঠের ছন্দ গড়ে দেয়। ছোট বাক্য দ্রুততা বাড়ায়; বড় বাক্য গভীরতা। কমাব—বেশি করুন মিশিয়ে। পুরোটাই যদি কমা-কমা হয়, পড়তে কষ্ট হবে; আবার শুধুই ছোট বাক্যও একঘেয়েমি তৈরি করে।

ছন্দের বাস্তব উদাহরণ — একই বক্তব্য দুইভাবে:
(ক) “শহরে ট্রাফিক ভীষণ। সবাই দেরি করছে। বাস আর নেই।” (বিরাম বেশি → দ্রুত, টুকরো টুকরো অনুভূতি)
(খ) “ট্রাফিক এতটাই ভীষণ যে সবাই দেরি করছে; বাসও মিলছে না, ফলে অফিস পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।” (একটা জটিল বাক্যে কারণ ও ফল রাখা → গভীরতা)

৬। পাংচার ও চিহ্নের ভূমিকা

কমা, সেমিকোলন, ড্যাশ, কোলন — এগুলো কেবল গ্রামার নয়, এগুলো পাঠকের শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে।

  • কমা — তালিকা, অভাবিত অংশ পৃথক করতে; কিন্তু অতিরিক্ত কমা বাঁধা দেবে।
  • সেমিকোলন — দুই সমমানের clause যুক্ত করতে।
  • ড্যাশ (—) — হঠাৎ এসে বিস্তার বা ব্যাখ্যা দিতে সুবিধা দেয়।
  • কোলন (:) — তালিকা বা ব্যাখ্যার সূচক হিসাবে ব্যবহার করুন।

৭। বাংলা-বিশেষ ট্রিকস (Bengali-specific tips)

বাংলা বাক্যগঠনে ক্রিয়া-স্থানে ভিন্নতা থাকতে পারে — রূপবৈচিত্র্য ঠিক রাখতে সাবধানে করুন:

  • উপসর্গ/অব্যয় সঠিক স্থানে রাখুন — “আমি দ্রুত সোজা গেলাম” এর মতো অপ্রাকৃত পদক্ষেপ এড়ান; “আমি দ্রুত বেরিয়ে গেলাম” ভালো।
  • বহুবচন ও একবচন কনসিস্টেন্ট রাখুন — বিশেষত নির্দেশ বা তালিকায়।
  • ব্যাকরণগত মিল (subject-verb agreement) নিশ্চিত করুন — এটি অনেক পাঠকের জন্য ভুল ধরায়।

৮। সাধারণ ভুল ও কিভাবে সারাতে হবে

  • Fragment (অপূর্ণ বাক্য): “কারণ খারাপ ছিল।” → সম্পূর্ণ: “কারণ রাস্তা খারাপ ছিল।”
  • Run-on (অনাবদ্ধ বাক্য): বেশি clause একসাথে: স্পষ্ট বিভাজন বা সেমিকোলন ব্যবহার করুন।
  • Misplaced modifier: “শুধু অল্প লোকগুলো ছিল মাঠে” → “মাঠে ছিল মাত্র অল্প লোক।”

৯। অনুশীলন (Exercises) — নিজে করে দেখুন

প্রতিটি অনুশীলনের আগে চেষ্টা করুন — পরে উত্তর চেক করতে “উত্তর দেখুন” খুলুন।

অনুশীলন ১ — সংক্ষিপ্ত করুন

নীচের বাক্যটি সংক্ষিপ্ত ও প্রাঞ্জল করে লিখুন:

“তিনি যে কাজগুলো সম্পন্ন করেছেন, সে সব কাজগুলোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের উন্নতি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।”

উত্তর দেখুন

উত্তর (একটি উদাহরণ): “তার কাজগুলো প্রতিষ্ঠানের উন্নতি স্পষ্ট করেছে।”

অনুশীলন ২ — active voice এ রূপান্তর করুন

“বহু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কর্মকর্তাদের দ্বারা।”

উত্তর দেখুন

উত্তর: “কর্মকর্তারা বহু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”

অনুশীলন ৩ — বাক্য মিলিয়ে ছন্দ আনুন

তিনটি ছোট বাক্যকে একটির মধ্যে মেশান: “সে পাহাড়ে উঠল। সে ক্লান্ত হল। সে নীচে নামতে সময় লাগল।”

উত্তর দেখুন

উত্তর: “পাহাড়ে উঠার পর সে ক্লান্ত হয়ে একটু সময় নিয়ে নীচে নামল।”

১০। ১০-মিনিটের দ্রুত এডিট রুটিন (Quick editing checklist)

১. প্রতিটি অনুচ্ছেদে একটি টপিক সেন্টেন্স আছে কি?
২. অপ্রয়োজনীয় শব্দ কাটা হয়ে গেছে?
৩. aktive voice-এর ব্যবহার যাচাই করা?
৪. কমা/পাংচার ঠিক আছে কি?
৫. সংক্ষিপ্ত বাক্য ও দীর্ঘ বাক্যের ভারসাম্য আছে কি?

১১। অনুশীলনের বাড়তি আইডিয়া (Daily practice ideas)

  • প্রতিদিন ১৫ মিনিট “Rewrite” — কোনো সংবাদপত্রের একটি সংবাদের প্রথম অনুচ্ছেদ নিয়ে সেটিকে ৩টি ভিন্ন শৈলীতে লিখুন।
  • হাইলি-রিডেবল প্যারাগ্রাফ রচনা — প্রতিদিন ১টি ব্লগপোস্টের খসড়া লিখে দ্রুত সম্পাদনা করুন।
  • রিড-আউট লাউড — নিজে উচ্চস্বরে পড়লে ভুল জায়গা সহজে ধরা পড়ে।

উপসংহার — সাহস যোগান

বাক্যগঠন শেখা কোনো একদিনে শেষ হওয়া কাজ নয় — এটা অভ্যাস। প্রথমে সরল বাক্য, পরে জটিলতা — ধাপে ধাপে। প্রতিদিন ছোট-ছোট অনুশীলন করলে ৩০ দিনের মধ্যে আপনি স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করবেন। লেখালেখি মানেই পরীক্ষা, কাটাছেঁড়া ও আবার শুরু — আর এই প্রক্রিয়াতেই আসল দক্ষতা আসে।

📚 কী লিখবেন – সিরিজ

✍️ সহযোগিতায় ChatGPT by OpenAI

নিতাই বাবু

নিতাই বাবু

পুরস্কারপ্রাপ্ত নাগরিক সাংবাদিক – ২০১৭। লেখালেখির শুরু শৈশবে, এখনো চলছে।
মূলত সমাজ, সংস্কৃতি, স্মৃতিচারণা ও ছন্দনিবদ্ধ রচনায় আগ্রহী।
ভাষার শুদ্ধচর্চা ও সাহিত্যসমৃদ্ধ বাংলার প্রতি অগাধ ভালোবাসা।

🌐 ব্লগ: নিতাই বাবু ব্লগ | জীবনের ঘটনা | চ্যাটজিপিটি ভাবনা

পোস্টটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

Facebook Facebook Twitter Twitter WhatsApp WhatsApp Email Email
এই পোস্টটি পড়েছেন: 0 জন

Comments

Popular posts from this blog

ফটোগ্রাফি টিউটোরিয়াল সিরিজ — পর্ব ৩

ফটোগ্রাফি টিউটোরিয়াল সিরিজ — পর্ব ১

এই পৃথিবীতে কলমের আবিষ্কারের ইতিহাস

উচ্চ রক্তচাপ ও নিম্ন রক্তচাপ হলে করণীয় — পূর্ণাঙ্গ তথ্য

ব্লগ মডারেটর টিউটোরিয়াল সিরিজ – পর্ব ১০: জনপ্রিয় ব্লগ প্ল্যাটফর্মে মডারেশন (ব্লগার, ওয়ার্ডপ্রেস ইত্যাদি)